গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস যাকে পশ্চিমা চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক বলা হয়, তিনিই প্রথম ওষুধের যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেন। হিপোক্রেটিসই চিকিৎসকদের জন্য ‘হিপোক্রেটিক ওথ’ চালু করেছিলেন, যা এখনও প্রাসঙ্গিক এবং আজ অবধি ব্যবহার হয়ে আসছে। রোগকে তখনই প্রথম Acute, Chronic, Endemic and Epidemic হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আর এ রোগ নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন যথাসময়ে যথার্থ ওষুধ। তার জন্য প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, নার্স- এ তিন পেশার সমন্বয় না ঘটলে কোনোভাবেই উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্ভব নয়। আমরা খুব ভালোভাবেই জানি, মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রের অন্যতম করণীয় হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের এই আকাক্সক্ষাটি বাংলাদেশের সংবিধানে সন্নিবেশিত করেছিলেন। ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) অনুসারে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব এবং অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুসারে জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
দেশে বর্তমানে জনগণ সরকারি ও বেসরকারি খাতে যে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে, তা পরিসর ও গুণগত মানের দিক থেকে আরও উন্নত করা প্রয়োজন। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১-এর মূলমন্ত্র ছিল ‘সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা’। বর্তমানে দেশে ১৩ হাজার ৪৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে (যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশ) এবং এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে জনগণকে সীমিত নিরাময় সেবা, প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক সেবাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা; অসংক্রামক রোগ শনাক্তকরণ এবং জরুরি ও জটিল রোগীদের রোগ শনাক্ত নিশ্চিতকরণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য উচ্চতর সেবা কেন্দ্রে রেফার করা হচ্ছে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মা ও শিশু নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা গ্রহণ করছে। বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, গ্রামীণ জনগণ কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবায় সন্তুষ্ট। বর্তমানে সমগ্র দেশে মাসে গড়ে ৯৫ লাখ থেকে ১ কোটি সেবাগ্রহীতা কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিয়ে থাকেন। ১৯৭৬ সালে ফার্মেসি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ফার্মেসিকে একটি পেশাগত বিষয় এবং ফার্মাসিস্টদের পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। স্বাস্থ্যসেবায় ডাক্তার ও নার্সের ভূমিকা যেমন অপরিসীম, ঠিক তেমনিভাবে ওষুধের সংরক্ষণ, গুণগতমান, সঠিক ওষুধ নির্বাচন ও ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য স্বাস্থ্যসেবায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের ভূমিকাও অপরিহার্য। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ও রূপকল্প-২০২১ অর্জনের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় ৯ হাজার ৫৯৮টি পদে সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ-পদায়ন করা হয়েছে। আরও চার হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং ৬০০ মিডওয়াইফ নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ০২ মে ২০১৭ তারিখে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে ৩৭৮ জন সহকারী সার্জন এবং ৬৭ জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ দেয়া হয়। এ ছাড়া ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন প্রদান করেছেন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৪ হাজার ৮৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা নিজেদের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে ওষুধ শিল্প (উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, মানের নিশ্চয়তা বিধান, গবেষণা ও উন্নয়ন, বিপণন, উৎপাদন পরিকল্পনা, ডিসপেন্সিং, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ারস, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ও রফতানি), সরকারি সংস্থা, বেসরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ফার্মেসি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ওষুধ শিল্পের বিকাশে আমূল পরিবর্তন। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশে উৎপাদন হচ্ছে এবং ১৮২টি দেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ওষুধ রফতানির পরিমাণ ও ওষুধ আমদানিকারী দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওষুধ শিল্পকে সামগ্রিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকার ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় একটি এপিআই পার্ক স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান পরিচালনা অব্যাহত আছে।
বর্তমানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দেশের অনেক বড় বড় ওষুধ কোম্পানিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ওষুধের অপব্যবহার রোধ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দেশে মডেল ফার্মেসি চালু করা হয়েছে। মডেল ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্স এবং ওষুধ সম্পর্কে তথ্যাদি দেয়ার পাশাপাশি ওষুধ সেবনবিধি সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছে। বর্তমানে ২০০টির অধিক মডেল ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কাজ করে যাচ্ছে। তাদের ‘ফার্মেসি ইন-চার্জ/ফার্মেসি ম্যানেজার’ হিসেবে পদায়নের জন্য ফার্মেসি কাউন্সিল উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এ ছাড়া এ দেশের কিছুসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতালে ইতিমধ্যে উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা তথা ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আসছে। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ ছাড়া গুণগত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া আদৌ সম্ভব নয়। আমাদের দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়াই ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্সিং ও ওষুধ বিতরণ করা হয়ে থাকে। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হাসপাতালে নিযুক্ত হলে এ দেশের হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তাদের পদোন্নতির সুযোগ করে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নতকরণের বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। ২০০৭ সালের তথ্য অনুসারে দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬০, যা বর্তমানে ১৩ হাজার ৪০০। বর্তমানে ১২টি সরকারি ও ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর গড়ে চার হাজার ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে এবং বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পাচ্ছে। তবে দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে না।
আমরা জানি, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১-এর ২৪নং অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যবিষয়ক মানবসম্পদ থেকে জ্ঞান ও দক্ষতার সর্বোচ্চ সুফল অর্জনের লক্ষ্যে সর্বস্তরের জন্য একটি সঠিক ও চাহিদাভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা এবং চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য জনশক্তির সব স্তরে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলির নীতিমালা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
তাছাড়া জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬-এর ৪.৩ অনুচ্ছেদে ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ৪.৩ অনুচ্ছেদের ‘ঙ’ উপ-অনুচ্ছেদে দেশে পর্যায়ক্রমে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে ‘হসপিটাল ফার্মেসি’ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে কর্মরত ফার্মাসিস্টদের তুলনামূলক বিবরণী :
মালয়েশিয়া : ফার্মাসিস্ট ও জনসংখ্যার আনুপাতিক হার=১:২৩১৫
সিঙ্গাপুর : ফার্মাসিস্ট ও জনসংখ্যার আনুপাতিক হার=১:২১৩০
ইংল্যান্ড : ফার্মাসিস্ট ও জনসংখ্যার আনুপাতিক হার=১:১০০০
এ অবস্থায় দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোয় (জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) ওষুধের নিরাপদ সংরক্ষণ, ওষুধের অপব্যবহার রোধ ও যৌক্তিক ব্যবহারে ফার্মাসিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক পর্যায়ে ওষুধ বিপণন ও ডিসপেন্সিং ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোয় উন্নততর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণে বহির্বিভাগ ফার্মেসিতে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ও আন্তঃবিভাগে প্রতি ৫০ শয্যার বিপরীতে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগদান এবং নিয়োগকৃত ফার্মাসিস্টদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে জনশক্তির সব স্তরে পদোন্নতির লক্ষ্যে হাসপাতাল ফার্মেসিতে নিন্মলিখিত পদবিন্যাস করা যেতে পারে। এ পদবিন্যাসের ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন হবে অনেকটা ম্যাজিকের মতো।
ধাপ পদের নামকরণ
১ ফার্মাসিস্ট (ক্লিনিক্যাল)/ফার্মাসিস্ট (ফার্মেসি ইন-চার্জ)
২ সিনিয়র ফার্মাসিস্ট (ক্লিনিক্যাল)
৩ উপ-প্রধান ফার্মাসিস্ট
৪ প্রধান ফার্মাসিস্ট
মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম ‘স্বাস্থ্যসেবা’কে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে জনস্বার্থে বিষয়টি খুবই জরুরি। বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের জন্য সরকার অনেক যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ডিজি, হেলথের অধীনে ‘ডাইরেক্টরস ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিসেস’ গঠন করে একজন পরিচালকের নেতৃত্বে এ কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে। পৃথিবীর উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দেশগুলো এটা অনেক আগে থেকেই করে আসছে (http://binfar.kemkes.go.id/en/unit-kerja-dan-pejabat/yanfar/#.WkZWPSOWYdU)।
প্রস্তাবিত পদবিন্যাসের আলোকে হাসপাতালগুলোয় হসপিটাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগ ও কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন একটি পরিচালক (হসপিটাল ফার্মেসি) সৃষ্টি করে দুটি উপ-পরিচালক ও চারটি সহকারী পরিচালকের পদ সৃষ্টি করাসহ জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করা খুবই জরুরি। আমরা নিশ্চিত এ রকম একটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
















