আজ ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২৬’।
ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (FIP) কর্তৃক নির্ধারিত এবারের প্রতিপাদ্য হলো—”সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য pharmacists (ঔষধবিদ/ফার্মাসিস্ট)-দের ক্ষমতায়ন/ দায়িত্ব প্রদান ” (Empowering pharmacists for healthier futures)। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাসিস্টদের বহুমুখী অবদান এবং তাদের পেশাগত স্বীকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ ঔষধ উৎপাদন এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে বর্তমানে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
অভাবনীয় অর্জন ও শিল্পের বিকাশ:
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আজ দেশের অন্যতম প্রধান একটি গর্বের জায়গা। দেশে ব্যবহৃত ঔষধের প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের ১৫০-এরও বেশি দেশে তা রপ্তানি হচ্ছে। এই অসাধারণ সাফল্যের নেপথ্যের মূল কারিগর হলেন আমাদের দেশের ফার্মাসিস্টরা। ঔষধ গবেষণা, ফর্মুলেশন, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Control) এবং মান নিশ্চিতকরণ (Quality Assurance) পর্যায়ে ফার্মাসিস্টদের নিরলস শ্রম দেশের ঔষধ শিল্পকে বিশ্বদরবারে একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে। বিশেষত, গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (GMP) এবং গুড ল্যাবরেটরি প্র্যাকটিস (GLP) কঠোরভাবে অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক মানের ঔষধ উৎপাদনে তাদের দক্ষতা প্রশংসনীয়।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও নতুন দিগন্ত:
ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা কেবল ঔষধ কারখানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সরাসরি রোগীর সেবায় যুক্ত হবে। বিশ্বব্যাপী রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবায় ক্লিনিক্যাল এবং হসপিটাল ফার্মাসিস্টদের যে কদর রয়েছে, বাংলাদেশেও তার দিগন্ত ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে।
অধিকন্তু, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ব্যবহার-পরবর্তী সুরক্ষা পর্যবেক্ষণে ‘ফার্মাকোভিজিল্যান্স’ (Pharmacovigilance) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ঔষধ উদ্ভাবন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফার্মাসিউটিক্যাল রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স-এর গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের ঔষধ বিষয়ক আইন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলো আরও আধুনিকায়ন করা হলে, এই খাতে পেশাজীবীদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়:
অভাবনীয় সাফল্যের পরও বাংলাদেশে ফার্মাসিস্টদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, ফার্মাসি শিক্ষার কারিকুলাম এবং শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার মধ্যে এখনও বেশ কিছুটা শূন্যতা বিদ্যমান। যুগোপযোগী শিক্ষা, নিয়ন্ত্রক নীতিমালার ওপর মানসম্মত দেশীয় রেফারেন্স বা পাঠ্যবইয়ের অভাব এবং পেশাজীবী ফার্মাসিস্টদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকট।
দ্বিতীয়ত, দেশের হাসপাতাল ও কমিউনিটি ফার্মেসি ব্যবস্থা এখনও আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উন্নত বিশ্বে রোগীদের ঔষধের সঠিক ব্যবহার, ডোজ নির্ধারণ এবং ড্রাগ-ইন্টারঅ্যাকশন নিয়ে ফার্মাসিস্টগন সরাসরি পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যা আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখনো ব্যাপকভাবে চালু হয়নি। এর ফলে রোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই ঔষধের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পাশাপাশি, ড্রাগ লেজিসলেশন (Drug Legislation) বা ঔষধ আইনের যুগোপযোগী সংস্কার ও এর কঠোর প্রয়োগের পথেও দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে, যা সার্বিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।
পরিশেষে “Empowering pharmacists for healthier futures” — এবারের এই প্রতিপাদ্যটিকে সার্থক করতে হলে রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ফার্মাসি শিক্ষার আধুনিকায়ন, পেশাজীবীদের জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং রেগুলেটরি বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ঔষধ শিল্পে অর্জিত বিপুল সাফল্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও মডেল ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা গেলে, নিরাপদ ঔষধ সেবন ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবেই বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২৬-এর মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে।